Sunday , 17 February 2019

হরিলুট প্রকল্প-১ : ইদিলপুরে ৪৬৬ শ্রমিকের জায়গায় ১২২

শরীয়তপুর২৪ রিপোর্ট ॥ শরীয়তপুরের বিভিন্ন ইউনিয়নে অতি দরিদ্রের কর্মসংস্থান প্রকল্পে হরিলুট চলছে। প্রকল্পের দরিদ্র শ্রমিকদের জন্য বরাদ্দ অর্থের ৪০ থেকে ৬০ শতাংশ অর্থ বিভিন্নভাবে আত্মসাৎ করা হচ্ছে। কর্মহীন অতি দরিদ্র মানুষের কর্ম সংস্থানের মজুরি হিসেবে বরাদ্দকৃত অর্থের একটি বড় অংশ চলে যাচ্ছে প্রকল্প সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা, জনপ্রতিনিধি ও কিছু অসাধু সাংবাদিকদের পকেটে। এ নিয়ে ধারাবাহিক প্রতিবেদনের ১ম পর্বে দেখুন ইদিলপুর ইউনিয়নের চিত্র।
গোসাইরহাট উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, ৯ এপ্রিল থেকে গোসাইরহাটের ৮টি ইউনিয়নে অতি দরিদ্রের কর্মসংস্থান প্রকল্পের কাজ শুরু হয়েছে। ৮টি ইউনিয়নে সর্বমোট ২ হাজার ৪শ ৩৯ জন শ্রমিকের বিপরীতে মজুরি হিসেবে ১ কোটি ৯৫ লক্ষ ১২ হাজার টাকা অর্থ বরাদ্দ রয়েছে। এর মধ্যে ইদিলপুর ইউনিয়নের ৭টি প্রকল্পে ৪৬৬ জন শ্রমিকের বিপরীতে ৩৭ লক্ষ ২৮ হাজার টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে।
বুধবার (১৮ এপ্রিল) সরজমিনে ইদিলপুর ইউনিয়নের বিভিন্ন প্রকল্প ঘুরে দেখা যায়, ৭টি প্রকল্পে বরাদ্দকৃত ৪৬৬ জন শ্রমিকের স্থলে মাত্র ১২২ জন শ্রমিক কাজ করছেন। অর্থাৎ পুরো ইউনিয়নে বরাদ্দকৃত শ্রমিকের প্রায় চার ভাগের তিন ভাগ শ্রমিক-ই কাজ করছেন না এবং এই শ্রমিকদের জন্য বরাদ্দকৃত টাকা বাস্তবে অব্যবহৃত থেকে যাচ্ছে।

৫০ জন শ্রমিকের জায়গায় ১৩ জন

১ নং ওয়ার্ডের মাছুয়াখালি নুরু ঢালীর বাড়ি হইতে তোফাজ্জেল মাদবরের বাড়ি পর্যন্ত একটি মাটির রাস্তা পুননির্মাণ করা হচ্ছে। এই প্রকল্পের সভাপতি হচ্ছেন ১ নং ওয়ার্ড ইউপি সদস্য ইউনুস ঢালী। এখানে ৫০ জন শ্রমিক বরাদ্দ থাকলেও কাজ করছেন মাত্র ১৩ জন। প্রকল্পে কর্মরত শ্রমিকদের সর্দার মোস্তফা কামাল বলেন, বুধবার পর্যন্ত তারা ৮ দিন কাজ করছেন। প্রতিদিন তিনি সহ ১৩ জন শ্রমিক সকাল ৯টা থেকে বিকাল ৩ টা পর্যন্ত কাজ করেন। তাদের দৈনিক মজুরি ৩শ টাকা।
এই প্রকল্পে ৫০ জন শ্রমিকের জন্য ২শ টাকা করে প্রতিদিন ১০ হাজার টাকা বরাদ্দ রয়েছে। তবে শ্রমিকদের মজুরি ৩শ টাকা করে হওয়ায় ১৩ জন শ্রমিক মজুরি নিচ্ছেন ৩ হাজার ৯শ টাকা। বাকী ৬ হাজার ১শ টাকা রয়ে যাচ্ছে। এভাবে ৮ দিনে ৪৮ হাজার ৮শ টাকা প্রকল্পে খরচ করা হয় নাই। এভাবে ৪০ দিন কাজ করলে ২ লক্ষ ৪৪ হাজার টাকা অব্যবহৃত থেকে যাবে। অর্থাৎ এই প্রকল্পের শ্রমিকদের জন্য ৪০ দিনে বরাদ্দকৃত ৪ লক্ষ টাকার মধ্যে মাত্র দেড় লক্ষ টাকা প্রকল্পে ব্যবহৃত হবে, বাকী আড়াই লক্ষ টাকা প্রকল্পে ব্যবহার করা হবে না।

৭৫ জন শ্রমিকের জায়গায় ১৮ জন

১, ২ ও ৩ নং ওয়ার্ডের সংরক্ষিত মহিলা সদস্য রিজিয়া বেগম একটি প্রকল্পের সভাপতি। বাবুল খানের বাড়ি হইতে উকিন্দ্র বাড়ৈর বাড়ি পর্যন্ত মাটির রাস্তা পুননির্মাণ প্রকল্পটিতে ৭৫ জন শ্রমিকের বিপরীতে ৬ লক্ষ টাকা বরাদ্দ রয়েছে। এখানে গিয়ে শ্রমিক সর্দার সহ ১৮ জনকে কাজ করতে দেখা যায়। প্রকল্পে কর্মরত শ্রমিকদের সর্দার আনসার মাদবর বলেন, প্রতিদিন ১৮ জন করে আজকে দিন পর্যন্ত ৮ দিন আমরা মাটি কাটছি।
সংরক্ষিত ৪, ৫ ও ৬ নং ওয়ার্ডের মহিলা সদস্য উম্মে কুলসুম লাইলি সভাপতি হিসেবে কালিখোলা ব্রীজ হইতে খোকন পেদার বাড়ি পর্যন্ত মাটির রাস্তাটি পুননির্মাণ প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছেন। এই প্রকল্পে ৬৫ জন শ্রমিক বরাদ্দ থাকলেও সরজমিনে গিয়ে ১২ জনকে পাওয়া যায়। তবে প্রকল্পে কর্মরত শ্রমিকদের সর্দার সফিক কবিরাজ বলেন, তারা আজকে ২৪ জন কাজ করছেন। বাকীরা খাওয়ার জন্য একটু দূরে গেছে।

৯০ জন শ্রমিকের জায়গায় ৩০ জন

ইদিলপুর ২ নং ওয়ার্ড সদস্য ফয়েজ আহাম্মদ একটি প্রকল্পের সভাপতি। এই প্রকল্পে ৯০ জন শ্রমিকের বিপরীতে ৭ লক্ষ ২০ হাজার টাকা বরাদ্দ থাকলেও সরজমিনে গিয়ে ৩০ জন শ্রমিক পাওয়া যায়। প্রকল্পে কর্মরত শ্রমিকদের সর্দার নুরুল হক বলেন, দৈনিক ৩শ ৫০ টাকা মজুরিতে ৩০ জন শ্রমিক ৮ দিন ধরে কাজ করছি।
৪ নং ওয়ার্ডের মেম্বার হাবিব ঘরামি একটি প্রকল্পের সভাপতি। সরজমিনে গিয়ে দেখা যায়, তিনি নিজে উপস্থিত থেকে প্রকল্পের কাজ তদারকি করছেন। তবে এই প্রকল্পে ৬০ জন শ্রমিক বরাদ্দ থাকলেও কাজ করছেন মাত্র ১৭ জন। প্রকল্পে কর্মরত শ্রমিকদের সর্দার জয়নাল মিয়া জানান, তারা দৈনিক ৩৫০ টাকা মজুরিতে এই প্রকল্পে কাজ করছেন। তবে শ্রমিক সংখ্যা কমবেশি হয়।
প্রকল্পের সভাপতি হাবিব ঘরামি বলেন, কয় জন শ্রমিক খাটালাম, কয় টাকা খরচ করলাম, সেটা বড় বিষয় নয়। প্রকল্পের কাজ ঠিকমতো করে দিলেই তো হয়।

৬০ জন শ্রমিকের জায়গায় ১২ জন

৩ নং ইউপি সদস্য নুরুল হক ঘরামি একটি প্রকল্পের সভাপতি। এই প্রকল্পে ৬০ জন শ্রমিকের বিপরীতে ৪ লক্ষ ৮০ হাজার টাকা বরাদ্দ থাকলেও সরজমিনে গিয়ে ১২ জন শ্রমিক পাওয়া যায়। প্রকল্পে কর্মরত শ্রমিকদের সর্দার মোতালেব রাড়ি বলেন, তারা প্রথম দিন থেকেই দৈনিক ৩৫০ টাকা মজুরিতে ১২ জন করে কাজ করছেন।
৭ নং ওয়ার্ড ইউপি সদস্য মকফর মোল্যা একটি প্রকল্পের সভাপতি। এই প্রকল্পে ৬৬ জন শ্রমিক বরাদ্দ থাকলেও কাজ করছেন মাত্র ২০ জন। প্রকল্পে কর্মরত শ্রমিকদের সর্দার আবু কালাম জানান, দৈনিক ৩৫০ টাকা মজুরিতে তারা ২০ জন শ্রমিক মকফর মেম্বারের প্রকল্পে কাজ করছেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ইউপি সদস্য বলেন, ইচ্ছে করলেই প্রকল্পে বরাদ্দকৃত শ্রমিক ঠিকমতো খাটানো যায় না। পিআইও অফিস, ব্যাংক, ট্যাগ অফিসার, চেয়ারম্যান, মেম্বার, সাংবাদিক- সব মিলিয়ে ৪০ থেকে ৫০ ভাগ টাকা খরচ আছে। সবকিছু ম্যানেজ করেই আমাদের কাজ করতে হয়।
ইদিলপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান দেলোয়ার শিকারী বলেন, শ্রমিকের সংকট রয়েছে। তাই প্রকল্পগুলোতে কম শ্রমিক খাটানো হচ্ছে। তবে কাজ না করা শ্রমিকদের হাজিরা কেন দেয়া হচ্ছে এবং তাদের উপস্থিত দেখিয়ে কেন বিল জমা দেয়া হবে জানতে চাইলে তিনি কোনো উত্তর দেননি।
গোসাইরহাট উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা তাহমিনা আক্তার চৌধুরি বলেন, কয়েকদিন আগে ইদিলপুর ইউনিয়নের প্রকল্প পরিদর্শনে গিয়ে আমিও এ ধরণের অনিয়ম পেয়েছি। বিশেষ করে মহিলা মেম্বার রিজিয়া বেগম বেশ অনিয়ম করেন। প্রতিটি প্রকল্পের সভাপতিদেরকে প্রকল্পের কাজে শ্রমিক বাড়াতে বলেছি। অনিয়মের বিষয়ে ইউনিয়নের চেয়ারম্যানকেও আপনারা একটু অবহিত করলে আমার জন্য ভালো হয়।
শরীয়তপুর২৪/গোসাইরহাট/অপরাধ/১৮ এপ্রিল, ২০১৮ খ্রি:


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*